আবু হুরায়রা (রাঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী পর্ব -০১

আবু হুরায়রা (রাঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

নাম : আবু হুরায়রা রা.-এর নামের ব্যাপারে বহু মতভেদ পাওয়া যায়। এমন মতভেদ অন্য কোনাে বর্ণনাকারী সাহাবীর নামের ব্যাপারে পরিলক্ষিত হয় । বিভিন্ন মনীষী তার ২০টি নামের কথা বলেন। কেউ বলেন ৩০টি।
আবার কেউ ৪০টি আলােচিত নামের কথাও উল্লেখ করেন ।
আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রহ. তাঁর ‘তাদরীবুর রাবী’ গ্রন্থে ২০টি
নামের কথা বর্ণনা করেন। কিন্তু সেগুলাের মধ্য হতে তিনটি নাম বেশি প্রসিদ্ধ।
যথা-
১. আবদুশ শামিস বিন সাখার
২.আবদুর রাহমান বিন সাখার
৩.আবদুল্লাহ বিন আম্র
বিশেষজ্ঞ আলেমগণ এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন যে, জাহেলী যুগে তার নাম ছিল ‘আবদুশ শামস্ আর মুসলিম যুগে আবদুর রাহমান’ । যদিও ইমাম বুখারী ও ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ্ আবদুল্লাহ বিন আম্মুর নামটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থে ইমাম হাকিম রহ. ইবনে ইসহাকে সূত্রে আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণনা করেন-
قال حين بغض اضاب عن أبي هريرة رضي الله عنه قال ان اي في
الجالية عن الشمس بي بي سي في الإسلام عن الخمي
উপনাম : মহান এই সাহাবীর নাম ‘আবু হুরায়রা’। এই উপনামটি এতােই প্রসিদ্ধ যে,
আসল নামটি মানুষ ভুলেই বসেছে। তবকাতে ইবনে সা’আদ’ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাঃ -এর এই উপনামের কারণ বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, একটি ছােট বিড়াল ছিল, যাকে আমি রাতের বেলা গাছে রেখে
আসতাম। সকাল হলে গাছ থেকে এনে তার সাথে খেলা করতাম।
এভাবেই বিড়ালটির সাথে আমার অস্বাভাবিক সখ্যতা গড়ে উঠে। আর
এতে করে আমার উপনাম ‘আবু হুরায়রা হিসেবে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল।
كانت هريرة صغيرة فكن إذا كان الليل وتها في شج فاذا أضب
آن ها قلبت بها قوي أبو هريرة
আল্লামা ইবনে আবদুল বার রহ. ‘আল ইসতি’বাব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন
যে, রাসূল সা. আবু হুরায়রা রা.’র এই উপনামটি রেখেছেন। অন্যদিকে
আল্লামা জালালউদ্দীন সুয়ূতী রহ. ‘তাদরীবুর রাবী’ গ্রন্থে তাঁর উপনাম
শুরুতে ‘আবুল আসওয়াদ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। (দরসে
তিরমিযী : খন্ড-১, পৃষ্ঠা- ২৬২। তিরমিযী, ২য় খন্ড ।)
পূর্বপুরুষ : আবু হুরায়রা রা.-এর নামের মতাে তাঁর পিতা-মাতার নামের মধ্যেও
বিভিন্ন মতভেদ পাওয়া যায়। তবকাতে ইবনে সা’আদ’ গ্রন্থে পিতার
দিক থেকে বংশ পরিক্রমা নিম্নরূপ উল্লেখ করা হয়েছে- ‘আবু হুরায়রা
আবদুর রহমান (উমায়ের আবদুল্লাহ্) বিন আমের বিন আবদে যিশশুরা
বিন তারীফ বিন গিয়াস বিন লাহীনাহ্ বিন সা’আদ, বিন সা’লাবাহ্ বিন
সুলাইম বিন ফাহম বিন গানাম বিন দাউস।
(আলবিদায়া ওয়ানিহায়াহ্ : খন্ড- ৮, পৃষ্ঠা- ৯১৯)
অপরদিকে ইবনে আসীর রহ. তাঁর পূর্ব পুরুষদের আনুক্রমিক এভাবে বর্ণনা করেছেন-
‘উমাইর বিন আমের বিন আবদুয যিশশুরা বিন তুরাইফ বিন আত্তাব বিন
আবূ যু’উফ বিন মুনাব্বিহ্ বিন সা’আদ বিন সা’লাবাহ্ বিন সুলাইম বিন।
ফাহুম বিন গানাম বিন সা’আদ। তার মাতার নাম ’উমাইয়্যাহ্’ অথবা ‘মাইমূনাহ্” বিনতে সবীহ্ বিন হারিস।
গঠন প্রকৃতিঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) এর গায়ের রং ছিল গমের মতো। উজ্জ্বল দাঁতবিশিষ্ট ছিলেন। সামনের সারির উভয় দাঁতের মাঝখানে সামান্য ফাঁকা ছিল। বাহুযুগল ছিল প্রশন্ত। চুল ছিল বাবরী কাট। যা দুভাগে ভাগ করে কাধ পর্যন্ত চড়িয়ে দিতেন। চুল ছিল শুভ্র আর তা রেশমের মতো কোমল। দাড়িতে মেহেদীর খেযাব লাগাতেন। যাতে তা লাল দেখা যেতো।
বংশ ও গােত্র : আবু হুরায়রা রা.’র বংশীয় সম্পর্ক ‘দাউস’ গােত্রের সাথে । দাউস গােত্রটি
আরবের ‘ইদ’ গােত্রের একটি শাখা। তারা তাদের পূর্ব পুরুষ ‘দাউস’ এর নামেই প্রসিদ্ধি পেয়েছে। আল্লামা ইবনে আসীর রহ. সেই বংশ পরিক্রমা এভাবে বর্ণনা করেছেন-
‘দাউস বিন আদনান বিন আবদুল্লাহ বিন যুহদান, বিন কাআব বিন
হারিস বিন কাআব বিন মালিক বিন নাযার বিন ইয। (উসদুল গাবাহ্ :
খন্ড- ৫, পৃষ্ঠা- ৩১৫)
সাধারণ বর্ণনা মতে, বনূ দাউস ইয়ামেনের এক প্রান্তে বসবাস করতাে। এই আবাস একটি পাহাড়ের পাশে ছিল। কিছু সংখ্যক উলামার ধারনা- ‘তবালা’ নামীয় এলাকার আশেপাশে ছিল দাউস গােত্রের বসবাস।
শুভ জন্ম : আবু হুরায়রা রা. হিজরতের আনুমানিক ২৪ (চব্বিশ) বছর
পূর্বে নিজ বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন।
শিশুকাল থেকে যৌবন পর্যন্ত ।
আবু হুরায়রা রা, খুব ছােটবেলাতেই বাবার ছায়া থেকে বঞ্চিত হন।
পৈত্রিক এলাকাতেই তিনি প্রচন্ড অভাব-অনটন আর দারিদ্রতার কষাঘাতে
লালিত-পালিত হনঃ  আম্মাজান খুবই কষ্ট-ক্লেশ আর সীমাহীন পরিশ্রমের বিনিময়ে খােরপােষের দায়িত্ব আঞ্জাম দিতেন। আবু হুরায়রা রা.’র ছােট বেলার অবস্থা সম্পর্কে যদিও খুবই সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য বিবৃত আছে, তবে এটা সহজেই জানা যায় যে তিনি কিশােরকালে ছাগল চড়াতেন। প্রতিদিন হাগল বনে নিয়ে যেতেন, সন্ধা পর্যন্ত সেখানে
চড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসতেন। বিভিন্ন লক্ষণে আরাে বােঝা যায়, তিনি ছােট বেলাতেই লেখা-পড়ার সাথে কিছু সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাই কখনাে দেখা যেতাে, কবিতার পংক্তির সাথে মিল রেখে তৎক্ষণাত আরেকটি পংক্তি বলে দিতেন। বসরা বিনতে গাযওয়ান- এর কাছে শুধু রুটির বিনিময়ে চাকরি করতেন। তার অর্পিত দায়িত্ব
ছিল- যখন বসরা কোথাও যেতাে তখন খালি পায়ে দৌড়ে সেই সাওয়ারির সাথে চলবে। আল্লাহর ইচ্ছায় পরে সেই মহিলা আবু হুরায়রা রা.-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। যদিও পিতৃভূমিতে জীবনকালের ৩০টি বসন্ত দারিদ্রতার সাথে লড়াই করতে হয়েছে, কিন্তু ৬ হিজরীর শেষ দিকে যখন তিনি স্বগােত্রীয়দের সঙ্গে মদীনা মুনাওয়ারায়
হিজরত করেছেন তখন তুলনামূলক কিছুটা স্বচ্ছলতা দেখা দিয়েছিল যা দিয়ে একজন গোলাম রাখা যেতাে।
কুফর থেকে ইসলামগ্রহণ পর্যন্তঃ
তােফাইল বিন ওমর দাউসী রা. যিনি আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর স্বগােত্রীয় ছিলেন তিনি হিজরতের পূর্বে মক্কাতেই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। ইসলামের আলােক মশান অন্তরে নিয়ে ইসলাম প্রচারের জন্য ইয়ামেনে ফিরে আসেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় দাউস গােত্রের লােকেরা ইসলামের ঝান্ডাতলে আশ্রয় নিতে থাকে। সপ্তম হিজরীতে ‘খাইবার যুদ্ধের প্রাক্কালে ইয়ামেনের একটি জামাত নিয়ে আল্লাহর নবী সা.-এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার আকুল আগ্রহে মদীনা মুনাওয়ারায় রওয়ানা হন। কিন্তু মদীনা তাইয়্যিবায় পৌছে দেখলেন রাসূলে আক্রাম সা, খাইবারে তাশরীফ
নিয়ে গেছেন। এ খবর শুনে তারাও খাইবারের দিকে রওয়ানা হন। খাইবারে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সা.-এর মুবারক হাতে আবু হুরায়রা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হন। ( সিয়ারুস্সাহাবাহ্ : খন্ড -২, দ্বিতীয় অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৪৯-৫০) । দারসে তিরমিযী: খন্ড-১ পৃষ্ঠা-১৬১)

Leave a Reply

Your email address will not be published.