ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ ব্যবসা/ হারাম রিযক

শিরােনামে লেখা হয়েছে এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলাে মুসলিম ব্যবসায়ী ভায়েরা যেন অবৈধ ব্যবসা হতে নিজেকে রক্ষা করতে পারে এবং তাঁর আয় উপার্জন হালাল করতে সচেষ্ট হয় যাতে আল্লহ পাক তাঁর এই হালাল রুজির মাধ্যমে তাকে ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্যমন্ডিত করেন। সম্মানিত মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ, এতে কোন সন্দেহ নাই যে, ক্রয়-বিক্রয় একটি স্বীকৃত বৈধ পন্থা। যেরূপ, আল্লহ পাক সার্বিকভাবে শরীয়ত সম্মত বৈধ পন্থায় জীবিকা অন্বেষণের আদেশ দিয়েছেন তদ্রপ বিশেষভাবে ব্যবসা তথা ক্রয়-বিক্রয় করেও জীবিকা অর্জনের তাকিদ দিয়েছেন।

“ আল্লহ্ পাক ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সূদ হারাম (অবৈধ) করেছেন।”(সূরা বাকারা : ২৭৫।]


يا أيها الذين آمنوا إذا نودي للصلواة الجمعة فاسعوا إلي
ذكر الله وذروا البيع ذلكم خير لكم إن كنتم تعلمون فإذا قضيت
الصلوا فانتشروا في الأرض وابتغوا من فضل الله واذكروا الله
كثيرا لعلكم تفلحون


মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়, তখন তােমরা আল্লহর স্মরণের পানে তাড়াতাড়ি কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তােমাদের জন্যে উত্তম যদি তােমরা বুঝ। অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তােমরা পৃথিবীতে
ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর ও আল্লহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তােমরা সফলকাম হও।
[ সূরা জুমআ ৬২ঃ ৯-১০।]

আল্লাহ পাক রব্দুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সূরা নূরের ৩৬-৩৭নং আয়াতে ঐ সমস্ত বান্দাদের প্রশংসা করেছেন যারা ব্যবসা করার মাধ্যমে নিজেদের রিক অন্বেষণ করার এবং ইবাদতের মাঝে অপূর্ব সমন্বয় সাধন করে চলে।


عن ذكر الله في بيوت أذن الله أن ترفع ويذكر فيها اسمه يسبح له فيها رجال لا تلهيهم تجارة ولا بيع
بالغدو والآصال . وإقام الصلوة و إيتاء الزكوة تاون يوما تتقلب فيه القوب والأبصاره

আল্লহ সে সব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলিতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার অনুমতি দিয়েছেন,

সেখানে সকাল সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।

এ সমস্ত ব্যক্তিগণ যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে না

এবং নামায কায়েম যাকাত প্রদান করা থেকেও বিরত থাকেন না

বরং তারা ভয় করে সেই দিনকে (কেয়ামত) যেদিন অন্তর ও দৃষ্টি সমূহ উল্টে যাবে।

উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে একথাই আলােচিত হয়েছে যে, মুসলমানদের এরূপ নীতি হওয়া উচিত যে,

তারা ব্যবসা বাণিজ্য করার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করবে
কিন্তু যখন নামায এবং অন্যান্য ইবাদতের সময় উপস্থিত হবে তখন ক্রয়-বিক্রয় হতে বিরত থাকবে

এবং নামাযের দিকে ধাবিত হবে। আল্লহ পাক সূরা আনকাবুতের ১৭নং আয়াতে ইবাদত

করার সাথে সাথে রিযকের সন্ধান করার আদেশ দিয়েছেন।


فاتوا عند الله الرزق واعبدوه واشكروا له اليه ترجعون ه

তােমরা আল্লাহর নিকট রিযক অন্বেষণ কর, তার ইবাদত কর ও তার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। নিশ্চয় জানিও যে, তার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবসা করা শরীয়ত সমর্থিত। এতে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রভূত উপকাৱিতা রয়েছে। ক্রয়-বিক্রয় নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় এবং শরীয়ত সমর্থিত যতক্ষণ পর্যন্ত না তা দ্বারা ইবাদতে ক্ষতি হয় অথবা মসজিদে জামাতের সাথে নামায আদায়ে বিলম্ব ঘটায়। মহানবী (সা) এর বাণী।


التاجر الصندوق الأمسين مع النبيين والصدقين والشهداء
والصالحين –

.
সৎ, বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নবী, সত্যবাদী, শহীদ এবং সৎকর্মশীলদের সাথে
কেয়ামতের দিন অবস্থান করবে।[ ইমাম তিরমিযী এ হাদীছকে হাসান বলেছেন।]
অর্থাৎ যে ব্যবসায়ী ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সৎ ও বিশ্বস্ত হবে ঐ সমস্ত গুণীজনের
সাথে কেয়ামতের দিন তারা অবস্থান করবে এটা একজন সাধারণ মানুষের জন্য
অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন অবস্থান যা এই শ্রমের মর্যাদার প্রমাণ করেছে।
-…-
فبرافيني وسئل صلي الله عليه وسلم أي الكسب أطيب قال:
وعمل الرجل بيده
.
“রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রশ্ন করা হল, কোন উপার্জন সর্বোত্তম । মহানবী (সা) বলেন, নেক কাজ এবং মানুষ হাত দ্বারা যে জীবিকা উপার্জন করে”। [ আহমাদ।।
.
البيان بالخيار مالم يتفرقا فإن صدقا وبينا بورك لهما في
بيعهما وإن كذبا وكتما محقت بركة بيعهما
.
ক্রেতা ও বিক্রেতার উভয়ের পণ্যের উপর অধিকার রয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত না উভয়ে আলাদা হয়ে যায়। এমতাবস্থায় যদি উভয়ে সত্য বলে এবং বস্তুর দোষত্রুটি বর্ণনা করে তবে তাদের ব্যবসা বরকত পূর্ণ হয়। আর যদি মিথ্যা বলে এবং
দোষক্রটি লুকিয়ে রাখে তবে তাদের ব্যবসা হতে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়। অতএব উওম উপার্জনকারী সেই ব্যবসায়ী, যিনি সত্যবাদী ও বৈধ উপায়ে ব্যবসা করেন এবং নিকৃষ্ট উপার্জনকারী ঐ ব্যক্তি যিনি মিথ্যা, বােকা, দোষত্রুটি গােপন এবং কুট কৌশলের মাধ্যমে ব্যবসা করল ।
.
مر رسول الله صلي الله عليه وسلم علي المسلمين وهم يتبايعون ويشترون في سوق المدينة فقال عليه الصلاة والسلام
يا معشر التجار فرفعوا إليه رؤوسهم ينتظرون ماذا يقول صلی الله عليه وسلم فقال لهم إن التجار يبعثون فجار إلا من أتقي
وبر وصدق الله و
.
“একদা মহানবী (সা) মুসলমানদের এক জামাত অতিক্রম করছিলেন। সেই সময় তারা মদীনার বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমতাবস্থায় নবী (সা) বললেনঃ হে ব্যবসায়ী দল ও তারা নবী (সা)এর দিকে তাদের মস্তক উত্তোলন করলেন। নবী (সা) কি বলবেন সেজন্য অপেক্ষমান . ছিলেন। তিনি (সা) বললেন ও ব্যবসায়ীদেরকে কেয়ামতের দিন পাপী হিসেবে উঠানাে হবে কিন্তু যে আল্লাহকে ভয় ও বৈধ উপায়ে ব্যবসা করল আর সত্য কথা বলল সে ব্যতীত”।
[ তিরমিযী ]
.
মহানবীর (সা) জীবনচরিত পাঠে আমরা দেখতে পাই যে, মহানবী (সা) নবুয়্যতের পূর্বে হযরত খাদিজা (রা) এর মাল নিয়ে ব্যবসা করেছেন এবং তিনি সে ব্যবসায় ক্রয়-বিক্রয় ও লাভবান হয়েছিলেন। অনুরূপভাবে আসহাবু রাসূলিঙ্কাহ বা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবীগণও কেনা বেচা তথা ব্যবসা বাণিজ্য করেছেন। তন্মধ্যে কেহ কেহ ধনাঢ্য ছিলেন। যারা বিপুল ধন সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে উপকার করেছেন। যেমন- ওসমান বিন আফফান যিনি জাইশুল উসরাকে জিহাদের জন্য একাই সম্পূর্ণ বাহিনীকে অস্ত্র-শস্ত্র দ্বারা সজ্জিত
করেছিলেন। এভাবে আব্দুর রহমান বিন আউফ(রা) যিনি মুসলমানদেরকে
জিহাদের সময় এবং তাদের প্রয়ােজনের সময় আর্থিকভাবে ব্যাপক সাহায্য
সহযােগিতা করতেন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে যে ব্যক্তিটির নাম উল্লেখ যােগ্য তিনি
হলেন প্রথম খলিফাতুর রাসূল আবু বকর সিদ্দিক (রা)। তিনিও ব্যবসায়ী ছিলেন ও
তিনি তার সম্পদ ইসলাম ও মুসলমানদের সহযােগিতায় অকাতরে বিলিয়ে
দিয়েছেন, হিজরতের পূর্বে ও হিজরতের পরে এবং তিনি ছিলেন আল্লাহর পথে দান
করার ক্ষেত্রে অন্যদের … চেয়ে বহু বহুগণ অগ্রগামী।
.
অতএব উপরােক্ত আলােচনায় আমরা জানতে পারলাম, বিভিন্ন বৈধ পন্থায় জীবিকা অর্জন করাতে প্রভূত উপকারীতা রয়েছে এবং এই সমস্ত পন্থাগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ পন্থা হলাে ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসায়িক পন্থা । কিন্তু এ ব্যাপারে যে বিষয়টির প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত প্রয়ােজন, তা হলাে ক্রয়-বিক্রয় তথা ব্যবসা যেন শরীয়ত সম্মত নিয়মাবলীর কঠোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এবং তা একারণে যে, এর দ্বারা মুসলমান ব্যবসায়ী হারাম বস্তুর লেনদেন এবং নিকৃষ্ট পন্থায় উপার্জন থেকে বিরত থাকবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (সা) ব্যবসা সংক্রান্ত কতগুলাে
ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করেছেন একারণে যে, এরূপ ব্যবসায়ের দ্বারা নিকৃষ্ট উপার্জনের
পথ রয়েছে, মানুষের ক্ষতির কারণ রয়েছে। এবং ব্যবসায়ীরা অবৈধ পন্থায় মানুষের
কাছ থেকে অর্থ আদায় করে তা দ্বারা নিজেদের জীবন নির্বাহ করে। পরবর্তী
আলােচনা সেই সমস্ত ব্যবসা যা শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম তা আলােচনা করব।
 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published.