উমর (রাঃ)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

উমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর কুনিয়াত বা পারিবারিক নাম ‘আবু হাফস’।  উপাধি ‘ফারুক’; কারণ তিনি মক্কায় ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি প্রকাশ করলে তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফর ও ইমানের মধ্যে সৃষ্টি করে দেন স্পষ্ট ব্যবধান। তিনি হাতির বছরের তের বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় তার গায়ের রং ছিল লাল-সাদা মিশ্রণের উজ্জ্বল ফর্সা উভয় গণ্ডদেশ, নাক ও চোখ দুটো অত্যন্ত সুন্দর। পা ও দুই হাত মাংসে ভরা। ছিলেন দীর্ঘদেহী ও দৃঢ় শারীরিক গড়নের অধিকারী। মাথার সামনের অংশের চুল ঝরে গিয়েছিল। শারীরিক গড়ন এতাে দীর্ঘ ছিল যে, দূর থেকে মনে হতাে তিনি ঘােড়ায় আরােহণ করে আছেন। অত্যন্ত শক্তির অধিকারী ছিলেন। পাত্তা
দিতেন না দুর্বলতা ও অসহায়ত্বকে। দাড়িতে লাগাতেন মেহেদির খেজাব।
গোঁফের দুই পাশ ছিল লম্বা। হাঁটার সময় দ্রুত হাঁটতেন। কথা বলার সময়
জোরে বলতেন। আক্রমণ করতেন প্রবল বিক্রমে।
.
পরিবার : হজরত উমর রা.-এর বাবা খাত্তাব ইবনে নুফাইল ছিলেন কুরাইশ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁর দাদা নুফাইল ইবনে আবদুল উজ্জার কাছে। কুরাইশের লােকজন সালিসের বিচার নিতে আসত। তাঁর মায়ের নাম হানতামা বিনতে হাশিম ইবনে মুগিরা। কথিত আছে, তিনি ছিলেন আবু জাহলের বােন। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, তিনি ছিলেন হাশিমের মেয়ে অর্থাৎ আবু জাহল ইবনে হিশামের চাচাতাে বােন।
হজরত উমর রা.-এর ছেলে-মেয়ে তেরজন। তাঁদের নাম-জায়দ আকবর,
জায়দ আসগর, আসিম, আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান আকবর, আবদুর রহমান
আওসাত, আবদুর রহমান আসগর, ওবাইদুল্লাহ, ইয়াজ, হাফসা, রুকাইয়া, জায়নাব ও ফাতিমা।
.
যেসব নারীকে তিনি বিয়ে করেছেন তাদের সংখ্যা তেরজন। এরমধ্যে ওইসব নারীও অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তিনি জাহেলি যুগে বিয়ে করেছিলেন বা ইসলামি যুগে। এমনিভাবে ওইসব নারীও অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে তালাক দিয়েছিলেন বা
যারা শাহাদাতের সময় তার অধীনে ছিলেন। তিনি বিয়ে করতেন অধিক সন্তান লাভ এবং উম্মতে মুহাম্মাদিয়ার সংখ্যা
বাড়ানাের উদ্দেশ্যে। তাঁর উক্তি-‘আমি কেবল তাড়নার বশবর্তী হয়ে যৌন
চাহিদায় সাড়া দিই না। সন্তানের ব্যাপারটি না থাকলে আমি কোনাে নারীকে ।
দেখার প্রতি মােটেও ভ্রুক্ষেপ করতাম না।
.
‘আল্লাহর কসম! আমি অনেক সময় কামনা না থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীর
সঙ্গে মিলিত হই নেক সন্তানের আশায়; যে সন্তান আমার পর
মানবজাতিকে কল্যাণ পৌছাবে।’
.
অন্যত্র হজরত উমর রা. বলেন, নিজেকে আমি স্ত্রী সহবাসের জন্য এ কারণে বাধ্য করি যাতে তা দ্বারা এমন সন্তান জন্ম নেয়, যে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করবে এবং তাকে স্মরণ করবে। নিঃসন্দেহে ইসলাম গ্রহণের আগে মক্কাজীবনে উমর রা.-এর এই রাখালি পেশা তাঁকে এনে দিয়েছে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, বীরত্ব ও কঠোর স্বভাবের মতাে গুণাবলি ।
জাহেলি যুগে তার গােটা জীবন কেবল ছাগল চরানাের কাজেই ব্যাপৃত ছিল না;
T;১০ বরং যৌবনের শুরুতেই তিনি তৎকালীন অভিজাত আরবদের অবশ্য-
শিক্ষণীয় বিষয়গুলাে যথা : যুদ্ধবিদ্যা, কুস্তি, বক্তৃতা ও বংশতালিকা শিক্ষা
প্রভৃতি আয়ত্ত করেন এবং এসব বিষয়ে প্রাজ্ঞতা অর্জন করেন।
.
হজরত উমর রা, ব্যবসাও করেছেন। তা দ্বারা বেশ লাভবানও হয়েছেন। এই
ব্যবসা তাঁকে নিয়ে আসে মক্কার ধনীদের কাতারে। ব্যবসার উদ্দেশ্যে তিনি
যেসব শহরে গিয়েছেন, সেখান থেকে রপ্ত করেছেন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা।
গ্রীষ্মকালে সিরিয়া আর শীতকালে ইয়ামেনে ব্যবসার কাজে সফর করতেন।
.
কুরাইশ গােত্র ছিল সম্মানিত ও অভিজাত । ভাষা, সাহিত্য ও বাগিতায় তারা
ছিল অতুলনীয়। কোনাে বিষয়ে নিজ গােত্রের গৌরবগাঁথা বর্ণনার প্রয়ােজন
দেখা দিলে প্রতিপক্ষের দোষত্রুটি, নিন্দা, সমালােচনা উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করতে
হলে কুরাইশরা তাদের মনােনীত দূত উমর ইবনুল খাত্তাবের শরণাপন্ন
হতাে।” যুক্তিতর্কে প্রাঞ্জল ভাষায় বাগ্মিতায় কুরাইশরা এমনিতে গােটা আরবে
বিখ্যাত। তাদের মধ্যে দূতিয়ালির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়ার গৌরব ছিল
আসলেই সম্মানজনক এবং প্রশংসনীয় ।
.
হজরত উমর রা. মক্কার এমন একজন অধিবাসী যিনি অজ্ঞতার যুগেও
শিখেছিলেন লেখাপড়া। এটা তার শৈশবের জ্ঞানমনষ্কতার প্রমাণ বহন করে।
শুরু থেকেই তিনি নিজেকে মক্কার একজন আদর্শ মানব হিসেবে গড়ে তােলার
চেষ্টা করে আসছিলেন। নববি যুগেও অসংখ্য অন্যন্য গুণের কারণে তিনি
ছিলেন ঈর্ষণীয় পুরুষ। তম্মধ্যে লেখাপড়া ছিল এক চিত্তাকর্ষক বৈশিষ্ট্য। এই
বৈশিষ্ট্য তাঁকে রূপান্তর করেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে। প্রাথমিক শিক্ষা
তিনি গ্রহণ করেন আবু সুফইয়ানের পিতা হারব ইবনে উমাইয়ার কাছে।
.
এই শিক্ষাগত গুণের কারণে তিনি সেই সময়কার সভ্যতা-সংস্কৃতি সম্পর্কে
সম্যক অবগতি লাভ করেন। যদিও আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি হজরত
উমর রা.-এর ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা, যােগ্যতার উচ্চতা, কৃতিত্বের অনন্যতা
এবং আত্মশুদ্ধির প্রধান নিয়ামক শক্তি ছিল রাসুলুল্লাহ সা.-এর সার্বক্ষণিক
সাহচর্য এবং নববি শিক্ষালয়ের সাথে নিবিড় সম্পৃক্ততা। এটা এভাবে যে,
তিনি ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেই মক্কায় রাসুল সা.-এর সঙ্গে সঙ্গে চলতে
লাগলেন। অনুরূপভাবে মদিনায়ও তিনি রাসুল সা.-এর আবাসস্থলের
নিকটবর্তী এলাকায় নিবাস গাড়েন। এখানেও তিনি কাছে পান রাসুলকে।
উমরের সেই আবাসস্থলটি বর্তমানে মসজিদে নববির সাথে লাগােয়া। কারণ,
আবাদ বেড়ে যাওয়ায় এবং মদিনা শহর প্রশস্ত হয়ে যাওয়ায় পার্শ্ববর্তী
এলাকাগুলােকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়েছে।
.
মােটকথা, ওই এলাকায় উমর রা. নিজেকে সাজিয়ে নেন। ইলম ও মারেফত
অর্জনের লক্ষ্যে সমগ্র মানবতার শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের সামনে নববি
.
শিক্ষালয়ে শিক্ষাগ্রহণের সুতীব্র বাসনা লালন করেন। এমন পথপ্রদর্শক ও
শিক্ষক যাকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন স্বয়ং পরম করুণাময় ।
গােটা পৃথিবী চলে এসেছিল তাঁর দৃষ্টিসীমার সামনে এবং পায়ের তলায় ।
অধিকাংশ ভূখণ্ডই স্বাধীন হয় তার শাসনামলে। দুনিয়া মাথা নত করে চলে।
এসেছে তার সামনে। অথচ তিনি তার দিকে চোখ তুলে তাকাননি। অন্তরে
সামান্য ইচ্ছেও জাগেনি দুনিয়ার প্রতি। বরং আল্লাহর দীনের শক্তি-সামর্থ্য
বাড়ানাে, মুশরিকদের শক্তিকে বিনষ্ট করে দেওয়াই ছিল তাঁর সার্বক্ষণিকের
চিন্তা। আল্লাহর দীনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারাটাকে সৌভাগ্য মনে
করতেন। প্রচেষ্টা পরিশ্রম ও তাকওয়া তার স্বভাব-জীবনে পরিণত হয় এক
অবিচ্ছেদ্য অংশে। এটা তার মূল বৈশিষ্ট্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.