ক্রয়-বিক্রয় ইবাদতের বাধা হয়ে দাঁড়ায়

      উপরােক্ত কথাটিকে ব্যাখ্যা করলে এর অর্থ হয় যে, ক্রয়-বিক্রয় যেন ইবাদতের সময় নিয়ে না নেয় অর্থাৎ ব্যবসায়ী তার ব্যবসায়ে তা ক্রয়-বিক্রয়ে মগ্ন। থাকাতে মসজিদে জামাতের সাথে নামায আদায়ে পিছিয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় সে। জামাতের সাথে নামায পড়তে পারে না অথবা নামাযের কিয়দংশ জামাতের সাথে পড়তে সক্ষম হয়। যদি এরূপ হয় তবে তার ঐ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ বা অবৈধ বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহ পাক সূরা জুমআর ৯, ১০ নং আয়াতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলােচনা করেছেনঃ
يا أيها الذين آمنوا إذا تؤدي للصلواة الجمعة فاسعوا إلي ذكر الله وذروا البيع ذلكم خير لكم إن كنتم تعلمون فإذا قضيت
الصلوا فانتشروا في الأرض وابتوا من فضل الله وانكروا الله كثيرا لعلكم تفلحونه
         মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়, তখন তােমরা আল্লাহর স্মরণের পানে তাড়াতাড়ি কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ। অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তােমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর ও আল্লহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে
তোমরা সফলকাম হও |
[ সূরা জুমআ ৬২ঃ ৯-১০।]
يا أيها الذين آمنوا لا تلهكم أموالكم ولا أولادكم عن ذكر الله
ومن يفعل ذلك فأولئك هم الخاسرونه
       মুমিনগণ! তােমাদের ধন সম্পদ ও সন্তান সন্তুতি যেন তােমাদেরকে আল্লহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তাে ক্ষতিগ্রস্থ। [ সূরা মুনাফিকূনঃ ৯।]
       আল্লহর ভাষ্য “আর তারাই ক্ষতিগ্রস্থ” এ ব্যাপারে হে ব্যবসায়ীগণ; আপনারা সাবধান হয়ে যান। প্রকৃত পক্ষে এ সমস্ত ব্যক্তিদের জন্য এটা একটি হুকুম যদিও তারা ধনাট্য হয় এবং প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয় এবং যদিও তাদের বহু সন্তান-সন্ততি থাকে তবুও তাদের এই ধনবল ও জনবল আল্লহর যে ইবাদত থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে তার বিনিময়যােগ্য হতে পারে না। এমতাবস্থায় যদিও তারা পার্থিব জগতে ব্যবসায়ী হিসেবে সাফল্যের শিখরে অবস্থান করে তবুও পরকালে তার জন্য শুধু রয়েছে ক্ষতি আর লােকসান। এই সমস্ত ব্যবসায়ীদের
তখনই প্রকৃত পক্ষে লাভবান হবে যখন দুইটি উত্তম বস্তুকে একত্রিত করবে।
অর্থাৎ যখন তারা ইবাদত ও জীবিকা অন্বেষণকে সমন্বিত করবে। অর্থাৎ ব্যবসায়ের
সময় তারা জীবিকা অন্বেষণ করবে এবং নামাযের সময় দুনিয়া ও আখেরাতের
কল্যাণকে একত্রিত করল এবং আল্লহর হুকুমকে অনুসরণ করল -“তােমরা
আল্লহর নিকট রিযিক তালাশ কর এবং তাঁর ইবাদত কর এবং যখন নামায
আদায় হয়ে যায় তখন তােমরা ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লহর ফজল
(ব্যবসায়ীকে আয় উন্নতি) তালাশ কর।” [সুরা জুমআঃ১০]
.
অতএব উপরােক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় ব্যবসা দুই প্রকার। প্রথমত ও পার্থিব যা ইহকালীন ব্যবসা আর দ্বিতীয়ত ও পরকালীন ব্যবসা। ব্যবসা করে উপার্জন করা এবং ধনী হওয়া পার্থিব ব্যবসা, এবং নেক কাজ করা পরকালীন ব্যবসা।
يا أيها الذين آمنوا هل أدلكم على تجارة تنجيكم من عذاب أليم – تؤمنون بالله ورسوله وتجاهدون في سبيل الله بأموالكم
وأنفسكم ذلكم خير لكم إن كنتم تعلمون – يغفرلكم توب ويدخلكم جنات تجري من تحتها الأنهار ومساكن طيبة في جثت
عدن ذلك الفوز العظيم – وأخري تحبونها نصر من الله وفئ قريب وبشر المؤمنين
মুমিনগণ আমি কি তােমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দিব, যা তােমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তােমরা আল্লহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লহর পথে নিজেদের ধন সম্পদ ও জীবনপণ করে জেহাদ করবে। এটাই তােমাদের জন্য উত্তম ; যদি তােমরা বােঝ। তিনি তােমাদের পাপরাশী ক্ষমা করবেন এবং এমন জান্নাতে দাখিল করবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং বসবাসের জন্য জান্নাতে উত্তম বাসগৃহে। এটা মহাসাফল্য। আরও একটি অনুগ্রহ দিবেন, যা তােমরা পছন্দ কর। আল্লহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন। [সূরা সফ ১০,১১,১২,১৩]
.
অতএব এই পরকালীন ব্যবসা যা অতি উত্তম ও লাভজনক, এর সাথে যখন
বৈধ পার্থিব ব্যবসা যুক্ত হয় তখন তা কল্যাণের উপর কল্যাণ হয়ে যায়। যাকে বলে
আলাের উপর আলাে। কিন্তু যখন মানুষ পার্থিব ব্যবসায়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় ।
এবং পরকালীন ব্যবসা পরিত্যাগ করে তখন সে আল্লাহর ভাষ্যনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত বলে
প্রমাণিত হয়। তারাই তাে ক্ষতিগ্রস্ত”।
যদি মানুষ আল্লাহর ইবাদতের দিকে অগ্রসর হয় এবং সময়মত নামায আদায়
করে এবং আল্লহর যিকির হতে গাফেল না হয় এবং আল্লাহ যা তার উপর ওয়াজিব
করেছেন তা আদায় করে দেয়। তবে আল্লহ তার জন্য তার রিযিকের দরজা খুলে
দেবেন। আর নামায হচ্ছে রিযিকের দরজা খােলার প্রধান কারণ।
.
وأمر أهلك بالصلوة واصطبر عليها لا نسئلك رزقان
نرزقك والعاقبة للتقوى
আপনি আপনার পরিবারকে নামাযের আদেশ দিন এবং নিজেও এর উপর
অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোন রিযিক চাইনা। আমিই আপনাকে
রিযিক দেই আর খােদাভীরুতার পরিণাম কল্যাণকর। [ সূরা ত্ব-হাঁ ঃ ১৩২।
অতএব নামায সম্পর্কে কিছু সংখ্যক ব্যক্তির এই ধারণা যে, তা রিযিক
অন্বেষণ ও কেনাবেচা হতে নিরুৎসাহিত করে। প্রকারান্তরে নামায তার বিপরীত।
কেননা নামায তার জন্য রিযিকের দরজা খুলে দেয়, রিযিক লাভে সহজ করে দেয়
এবং তাতে বরকত দান করা হয়। কেননা রিযিক হল আল্লাহর হাতে। যখন আপনি
তার যিকির ও ইবাদতের দিকে অগ্রসর হবেন তিনি তাতে আপনার উপর সন্তুষ্ট
হবেন এবং আপনার জন্য রিযিকের দরজা খুলে দেবেন। কেননা আল্লহ উত্তম
রিযিকদানকারী।
.
            আল্লহ সেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলিতে তার নাম উচ্চারণ করার অনুমতি দিয়েছে সেখানে সকাল-সন্ধায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘােষণা করে। এমন ব্যক্তিগণ যাদেরকে ব্যবসা ও ক্রয়-বিক্রয়
আল্লহর স্মরণ হতে বিরত রাখেনা এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। বরং তারা ভয় করে সেই দিনকে (কেয়ামত) যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। [ সূরা নূর ৩৬-৩৭]
            এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন কোন কোন সালফে সালীহিন উল্লেখিত ব্যক্তিরা ক্রয়-বিক্রয় তথা ব্যবসা করত এবং যখন তাদের কেহ যখন মুআজ্জিনের আযান শুনতে পেত এমতাবস্থায় যদি তাদের হাতে দাড়িপাল্লা থাকত যা দ্বারা বিক্রেতাকে মাল মেপে দিচ্ছে এ মুহুর্তে সে পাল্লাকে নামিয়ে ফেলত এবং নামাযের দিকে ধাবিত হত। উপরােল্লিখিত বক্তব্যের সারমর্ম এই যে, যদি ক্রয়-বিক্রয় নামাযের বিঘ্ন ঘটায় এবং আদায়ে বাধা দান করে তবে সেই ব্যবসা নিষিদ্ধ, অবৈধ এবং এর উপার্জন হারাম ও নিকৃষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.