হযরত উমর (রাঃ) এর ১০০ ঘটনার ১ নং ঘটনা- জাহেলি যুগ

জাহেলি যুগে উমর (রাঃ)

হযরত উমর (রাঃ) এর ১০০ ঘটনার ১ নং ঘটনা
হজরত উমর রা. জীবনের দীর্ঘ একটা সময় জাহেলি যুগে কাটিয়েছেন। কুরাইশ গােত্রের সমবয়সীদের সাথেই কাটে তাঁর বাল্যকাল। তবে একটি বিষয়ে তিনি তাদের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিলেন। তা হচ্ছে, তিনি ছিলেন লেখাপড়া জানা লােক| সে যুগে যাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিশাের বয়সেই বিভিন্ন দায়িত্বের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁর। বেড়ে
ওঠেন অভাব-অনটনের পরিবেশে। পরিবারে স্বচ্ছলতার কোনাে ছোঁয়া ছিল । বাবা খাত্তাব ছিলেন কঠোর ও নীরস প্রকৃতির লােক। উটের রাখালি কাজে ক্ষেতে পাঠাতেন বালক উমরকে। পিতার এই কঠোর মানসিকতা তাঁর
অস্তিত্বজুড়ে বেশ প্রভাব ফেলে। এটা তিনি মনে রেখেছেন আজীবন। আবদুর
রহমান ইবনে হাতিব ঘটনাটির বিবরণ দিচ্ছেন এভাবে :
‘আমি দাজনানে’ উমর ইবনে খাত্তাবের সঙ্গে ছিলাম। তিনি  আমাকে বললেন, এখানে আমি খাত্তাবের উট চরাতাম। তিনি  ছিলেন বেশ কঠোর প্রকৃতির। কখনাে আমি উট চরাতাম আবার কখনাে লাকড়ি কাটতে যেতাম।
.
তিনি কেবল নিজ পিতার উটই চরাতেন না; বরং বনু মাখজুমের সাথে সম্পৃক্ত
খালাদের উটও চরাতেন। এ ব্যাপারটি হজরত উমর রা, নিজেই ওইসময়
স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন তিনি আমিরুল মুমিনিনের পদে আসীন হন।
একদিন তার মনে উদয় হলাে, আমি তাে আমিরুল মুমিনিন হয়ে গেলাম।
আমার চেয়ে সেরা আর কে আছে? প্রবৃত্তির এই প্রবঞ্চনা ভেঙে দিতে তিনি
মুসলিম সমাবেশে দাঁড়িয়ে ঘােষণা দিলেন, ‘উমর! তুমি তাে ছিলে একসময়
ছাগলের সাধারণ এক রাখাল। বনু মাখজুমের সাথে সম্পৃক্ত তােমার খালাদের
উট চরাতে তুমি।
.
মুহাম্মাদ ইবনে উমর মাখজুমি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, উমর
ইবনুল খাত্তাব রা. was iSLal -এর ঘােষণা দিচ্ছিলেন। লােকজন সমবেত
হয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বললে তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা বাণী
বর্ণনা করলেন। নবি সা.-এর ওপর দরুদ পাঠ করলেন। এরপর বললেন, “হে
লােকেরা! আমি নিজেকে এমন অবস্থায় পেয়েছি যে, বনু মাখজুম গােত্রে থাকা
আমার খালাদের পশু চরাতাম । বিনিময়ে তারা আমাকে মিষ্টি খেজুর দিতেন বা
কিসমিস দিতেন। তা খেয়েই কেটে যেত আমার দিন। এরপর তিনি মিম্বরের
নিচে নেমে যান।
.
আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. তাঁকে বললেন, “হে আমিরুল মুমিনিন!
এদ্বারা আপনি বড় কিছু করেননি; কেবল নিজেকেই অপদস্থ করলেন।’ এ কথা
শুনে উমর রা. বললেন, “হে আউফের ছেলে! তােমার মন্দ হােক! শােনাে!
আমি একাকী ছিলাম। এমন সময়ে আমার নফস আমার ভেতর এই অনুভূতি
জাগিয়ে দিতে থাকে যে, জগতে তােমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কে আছে? সুতরাং
নফসকে আমি তার আসল প্রকৃতি বুঝিয়ে দিলাম। আরেক বর্ণনায় আছে, আমি আমার ভেতর কিছু (অহমিকা) দেখতে পেলাম। তাই এভাবেই তাকে ধুয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
.
কুরাইশের প্রতিনিধিত্ব, দূতিয়ালি ও বিচারকার্যে জড়িত থাকা এবং স্বভাব- প্রকৃতির কঠোরতার কারণে উমর রা. ইসলামের দাওয়াতের এারে শুরু দিকে কঠোরভাবে ইসলামের বিরোধিতা করতেন। এই নতুন ধর্ম মক্কার দৃঢ়-
সামাজিক ভিত কাঁপিয়ে তােলে কি-না এ ব্যাপারে তিনি উদ্বেগে থাকতেন।
আরবে তার একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা আছে। তার বাড়ি মক্কাতেই। আল্লাহর ঘর
জিয়ারতে লােকজন এসে থাকে দূর-দূরান্ত থেকে। এক্ষেত্রে কুরাইশদের রয়েছে
একটি উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। এসব কারণে মক্কা ছিল আত্মিক ও বৈষয়িক দিক
দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ। এটাই মক্কার উত্তরােত্তর উন্নতি এবং নেতাদের সম্পদশালী
হওয়ার নেপথ্য কারণ। এই বিবেচনায় মক্কার নেতারা দীন-ইসলামের চরম
বিরােধিতা করতে থাকে। অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন চালাতে থাকে
নওমুসলিমদের উপর। এই দুর্বল শ্রেণির উপর অত্যাচারের ক্ষেত্রে উমর রা.
ছিলেন বেশ কঠোর।
.
জাহেলি যুগে তিনি এক দাসীকে ইসলাম গ্রহণের কারণে এতাে মেরেছিলেন
যে, তাঁর হাত নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। চাবুক পড়ে গিয়েছিল হাত থেকে। আবু
বকর এদিক দিয়ে অতিক্রমকালে দাসীকে মারতে দেখেন। তখনই তিনি তাকে
কিনে মুক্ত করে দেন।
.
হজরত উমর রা. দীর্ঘ একটি সময় অতিবাহিত করেন জাহেলি যুগে। তিনি এ সময়টা পর্যবেক্ষণ করেন গভীরভাবে। এর চরিত্র, অভ্যাস, প্রকৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কে পুরােপুরি অবগত হন। প্রতিটি উক্তি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি অবলােকন
করেন। তাই যখন তিনি মুসলমান হন এবং ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য সম্পর্কে অবহিত হন, তখনই হেদায়েত ও ভ্রষ্টতা, কুফর ও ইমানের মাঝে বড় ধরনের স্পষ্ট ব্যবধান এঁকে দেন। বুঝিয়ে দেন হক-বাতিল তথা সত্য-
মিথ্যাকে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.