হযরত উমর (রাঃ) এর ১০০ ঘটনার ২ নং ঘটনা- ইসলাম গ্রহণ

ইসলাম গ্রহণ
হযরত উমর (রাঃ) এর ১০০ ঘটনার ২ নং ঘটনা
হজরত উমর রা.-এর মনমুকুরে সর্বপ্রথম ইমানের কিরণ ওইসময় বিচ্ছুরিত হয়, যখন সময়টা ছিল আবিসিনিয়া হিজরতের। উমর দেখছিলেন, কুরাইশের কিছু নারী মক্কা মুকাররামা থেকে হিজরতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা উমর ও তার মতাে অন্যান্য লােকদের নির্যাতন-নিপীড়নে ভীষণ উদ্বিগ্ন। মুসলিমদের ইমান ও আকিদা এবং বিপদ আপদে তাদের ধৈর্যধারণের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে তিনি হতবাক হয়ে যেতেন এবং মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে থাকতেন। অধিকন্তু কোনাে কোনাে সময় জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতাে তার মনে তত্ত্ব-চিন্তার
উদ্রেকও হতাে। তিনি আপন খেয়ালে চিন্তা করতে থাকতেন নানা বিষয়, নানা
কথা। কোনাে কোনাে সময় এটাও তাঁর মনে হতাে যে, ইসলাম যে পথের
সন্ধান দিচ্ছে, যে পথের চলার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে সম্ভবত সেটাই
উত্তম ও পবিত্রতম পথ। এজন্য প্রায়ই তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতেন। কোনাে
কোনাে সময় বিচলিত বােধ করতেন। কখনও-বা নিরুৎসাহিত বােধ করতেন।
তিনি ভাবতেন, পিতৃশহর ছেড়ে তারা আজ দূর কোথাও চলে যাচ্ছে। তাদের
দেখে কোমল হতে লাগল উমরের মন। ওই নারীদের ওপর তাঁর করুণা
এলাে। তাকে দন্ধ করতে লাগল অনুশােচনা। ওইসব নারীর সাথে তিনি
হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করতে শুরু করলেন-যারা উমরের কাছ থেকে কখনও
এমন আশা রাখেনি।
.
উম্মে আবদুল্লাহ বিনতে হানতা বলেন, মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতনকারী কাফেরদের মধ্যে উমর ছিলেন শীর্ষে। আমরা যখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় হজরত উমর রা, আমার কাছে এলেন। আমার স্বামী আমের ইবনে রবিয়া বাইরে গিয়েছিলেন। শিশু আবদুল্লাহ বাইরে খেলছিল। উমর জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাহর মা! তােমরা কোথায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছাে? আমি
বললাম, আল্লাহর মনােনীত দীন ইসলাম গ্রহণের কারণে তােমরা মক্কায়
আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছ; কিন্তু আল্লাহর দুনিয়া অনেক বড়। আমরা
বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। একথা শুনে উমর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
‘আল্লাহ তােমাদের সঙ্গী হােন।’ এ কথা বলে উমর চলে গেলেন। আমার স্বামী
আমের ইবনে রবিয়া ঘরে ফেরার পথে তাকে আমি একথা জানালাম। তিনি
বললেন, তােমার কি মনে হয় উমরও ইসলাম গ্রহণ করতে পারে? আমি
বললাম, হ্যা, আমি তাে এমনটাই মনে করি। তিনি বললেন, সে ততক্ষণ পর্যন্ত
মুসলমান হবে না, যতক্ষণ খাভাবের গাধা মুসলমান না হবে
.
ঘটনাটি গভীর রেখাপাত করে উমরের মনে। তিনি ভাবতে বাধ্য হন-কেন
আমার বুক অকারণে সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে! কোন কারণে এরা এতাে কষ্ট
নির্যাতন বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিচ্ছে? এতাে নিপীড়নের পরও কেন এসব
লোক অবিচল থেকে যাচ্ছে তাদের নতুন ধর্মে? এ কেমন বিস্ময়কর শক্তি?
উমর এসব ভাবছেন গভীর মনে। ভাবনার অতলান্তে গভীরভাবে ছটফট করতে
থাকে তাঁর অন্তরাত্মা।
.
উমর রা. এই ঘটনার কয়েকদিন পরই মুসলমান হয়ে যান। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে রাসুলুল্লাহ সা.-এর দোয়া বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রাসুল সা, দোয়া করেছিলেন ।
اللهم أعز الإسلام بأحب هذين الرجلين إليك، بأبي جهل أو بعمر
بن الخطاب. فكان أحبهما إلى الله عمر بن الخطاب
“হে আল্লাহ! আবু জাহল ইবনে হিশাম বা উমর ইবনুল খাত্তাবের মধ্যে যাকে আপনার পছন্দ, তাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিয়ে ইসলামের শক্তি দান করুন। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব ছিলেন আল্লাহর প্রিয়। ২৫ তাকে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দান করেন।
.
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি যখনই উমর রা.-কে কোনাে ব্যাপারে
এ কথা বলতে শুনেছি যে, আমার মনে হয় ব্যাপারটি এমন হবে, তবে তার
ধারণা মতাে ব্যাপারটি সংঘটিত হয়েছে। একবার উমর রা. বসা ছিলেন, এমন
সময় এক সুদর্শন লােক তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। উমর রা. বললেন, আমার
ধারণা ভুলও হতে পারে তবে আমার মনে হয় লােকটি জাহেলি ধর্মাবলম্বী
কিংবা ভবিষ্যৎ গণনাকারীও হতে পারে । লােকটিকে আমার কাছে নিয়ে এসাে।
তাকে তার কাছে ডেকে আনা হলাে। উমর রা. তার ধারণার কথা তাকে
শােনালেন। তখন লােকটি বললেন, ইতােপূর্বে আমি কোনাে মুসলিম ব্যক্তিকে
এরূপ কথা বলতে দেখিনি। উমর বললেন, আমি তোমাকে কসম দিয়ে
জিজ্ঞেস করছি, তুমি আমাকে তােমার বিষয়টি খুলে বল। তিনি বললেন,
জাহেলি যুগে আমি তাদের ভবিষ্যৎ গণনাকারী ছিলাম। উমর রা. বললেন,
.
জিনেরা তােমাকে যেসব কথাবার্তা বলেছে, এরমধ্যে কোন কথার্টি তােমার
কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল। তিনি বললেন, আমি একদিন বাজারে ছিলাম।
তখন একটি নারী জিন আমার কাছে এলাে। আমি তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখতে
পেলাম। তখন সে বলল, তুমি কি জিন জাতির অবস্থা দেখছ না, তারা কেমন
দুর্বল হয়ে পড়ছে? তাদের মধ্যে হতাশার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। তারা ক্রমশ
উটওয়ালাদের এবং চাদর-জুব্বা পরিধানকারীদের অনুগত হয়ে পড়ছে।
উমর রা. বললেন, সে সত্য কথা বলেছে। আমি একদিন তাদের দেবতাদের
কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন এক লােক একটি গরুর বাছুর নিয়ে উপস্থিত হল
এবং সেটা জবাই করে দিল। ওইসময় এক লােক এমন বিকট চিৎকার করে
উঠল, যা আমি আর কখনও শুনিনি। সে চিৎকার করে বলছিল, হে জলিহ!
একটি সাধারণ কল্যাণময় ব্যাপার শীঘ্রই প্রকাশ লাভ করবে। তা হল একজন
শুদ্ধভাষী লােক বলবেন——–(শুনে) লােকজন ছােটাছুটি করে পালাল ।
আমি বললাম, এ ঘােষণার রহস্য অবশ্যই বের করব। তারপর আবার ঘােষণা
দেওয়া হল হে জলিহ! একটি সাধারণ ও কল্যাণময় ব্যাপার অতি শীঘ্রই প্রকাশ
পাবে। তা হল একজন বাগ্মী ব্যক্তি —— এর প্রকাশ্যে ঘােষণা দেবে।
তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম। এর কিছুদিন পরেই বলা হল যে, একজন নবির
আবির্ভাব ঘটেছে।
.
একবার কুরাইশ নেতারা একটি সভায় সমবেত হন। তারা নবি সা.-এর
ব্যাপারে বিভিন্ন রকম চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে বলে ওঠেন-কে
আছাে এমন, যে মুহাম্মাদকে হত্যার দায়িত্ব নিতে পার? হজরত উমর রা. বলে
ওঠলেন, আমি এ দায়িত্ব গ্রহণ করলাম । এ ব্যাপারে সবাই সম্মতি প্রকাশ
করলেন।
.
উমরের বােন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব ও তার স্বামী সাইদ ইবনে যায়িদ তখন
আশ্রয় গ্রহণ করেছেন ইসলামের ছায়াতলে। ব্যাপারটা তারা উভয়েই উমরের
কাছ থেকে গােপন রেখেছিলেন। বনি আদি ইবনে কাআব গােত্রের নাইম
ইবনে আবদুল্লাহ নাহহামও গােত্রের লােকদের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের
কথা গােপন রাখেন। তিনি ছিলেন হজরত উমরেরই জাতিগােষ্ঠীভুক্ত।
আরেকজন সাহাবি খাব্বাব ইবনুল আরাত ফাতিমা বিনতে খাত্তাবের কাছে
মাঝে মাঝে তাঁকে কুরআন শরিফ পড়াতে আসতেন।
.
একদিন উমর তরবারি হাতে নিয়ে বেরিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সা. ও তাঁর
গুটিকয়েক সাহাবির সন্ধানে। তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন রাসুলুল্লাহ সা.
তাঁর চল্লিশজন নারী-পুরুষ সহচরকে নিয়ে সাফা পর্বতের কাছে একটি বাড়িতে
সমবেত হয়েছেন। সেখানে তার সাথে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.,
আবু বকর সিদ্দিক রা, ও আলি ইবনে আবু তালিব রা.-সহ সেইসব মুসলমান
ছিলেন, যারা আবিসিনিয়া না গিয়ে মক্কাতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়েছিলেন। নাইম ইবনে আবদুল্লাহ উমর রা.-এর
মুখােমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন-“কোথায় যাচ্ছ উমর?”
উমর বললেন, ‘আমি ওই বিধর্মী মুহাম্মাদের সন্ধানে যাচ্ছি যে কুরাইশদের
মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদেরকে বেকুব সাব্যস্ত করেছে, তাদের ধর্মের
নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবিকে গালি দিয়েছে। আমি তাকে হত্যা
করবে।
নাইম তাকে বললেন, ‘উমর! তুমি নিশ্চয়ই আত্মপ্রবঞ্চিত হয়েছাে। তুমি কি
মনে কর মুহাম্মাদকে হত্যা করার পর বনু আবদে মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে
এবং তুমি অবাধে বিচরণ করতে পারবে? তুমি বরং নিজের ঘর সামলাও।
এই আলােচনায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলতে লাগল উভয়ের মাঝে। উমর
বললেন, ‘আমার তাে মনে হচ্ছে, তুমিও বে-দীন হয়ে গেছ! আমি যদি নিশ্চিত
হতে পারি যে, তুমিও বে-দীন, তাহলে এ তরবারি দিয়ে আগে তােমার মস্তক
ছিন্ন করব।’
.
যখন নাইম ইবনে আবদুল্লাহ দেখলেন উমর তার প্রত্যয় থেকে ফিরে আসছে।
, তখন তিনি বললেন, “হে উমর! আমি তােমাকে অবহিত করছি তােমার
বােন এবং তার পরিবারের সবাই মুসলমান হয়ে গেছে। তুমিই কেবল ভ্রষ্ট পথ
আঁকড়ে ধরে আছ।’ একথা শুনে তৎক্ষণাৎ উমর বললেন, ‘আমাকে তাদের
নাম বলাে।’ নাঈম বললেন, তােমার ভগ্নিপতি ও চাচাতাে ভাই সাইদ ইবনে
জায়িদ ইবনে আমর এবং তােমার বােন ফাতিমা।
.
হজরত উমর রা. বােন ও ভগ্নিপতি মুসলমান হয়ে গেছে শুনে তাঁর মাথায়
আগুন চড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছুটলেন বােন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে।
তখন সেখানে খাব্বাব ইবনুল আরাতও উপস্থিত। তার কাছে পবিত্র কুরআনের
অংশবিশেষ ছিল, যা তিনি সাইদ দম্পতিকে পড়াচ্ছিলেন। ওই অংশে সুরা
তাহা’ লেখা ছিল। তারা উমরের আগমন টের পেলেন। খাব্বাব তৎক্ষণাৎ
আত্মগােপন করলেন ঘরের কোণায়। ফাতিমা কুরআন শরিফের অংশটুকু
লুকিয়ে ফেললেন। উমর ঘরে ঢােকার আগে শুনছিলেন, খাব্বাব কুরআন পড়ে
তাদের দুজনকে শােনাচ্ছেন। তিনি ঢুকেই বললেন, ‘তােমরা কী যেন পড়ছিলে
শুনলাম।’ সাইদ ও ফাতিমা উভয়ে বললেন, ‘তুমি কিছুই শােননি।’ উমর
বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি শুনেছি, তােমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছে
এবং সেটাই অনুসরণ করে চলছাে?’-এ কথা বলেই ভগ্নিপতি সাইদের দাড়ি
ধরে ফেললেন। উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। উমর ছিলেন
শক্তিশালী। তিনি ভগ্নিপতি সাইদকে মাটিতে ফেলে দিলেন এবং লাথি মারতে
লাগলেন। ফাতিমা উঠে এসে স্বামীকে তার মারধর থেকে রক্ষা করার চেষ্টা
করলেন। উমর ফাতিমাকে এমন জোরে আঘাত করলেন যে, তিনি আহত
হলেন।
.
বােন ক্রোধ ও আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন :
یا غم، إن كان الحق في غير دينك، أشهد أن لا إله إلا الله،
وأشهد أن محمدا شول الله
‘উমর! তােমার ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্ম যদি সত্য হয়, এ কথা বলে তিনি কালেমা শাহাদত পাঠ করলেন, ‘আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনাে উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সা, তাঁর বান্দা ও রাসুল।’
শাহাদাতের এ বাণী শােনামাত্র উমর রা.-এর ভাবান্তর শুরু হয়ে গেল। তিনি তাঁর বােনের রক্তাক্ত মুখমণ্ডল দেখে লজ্জিত হলেন। তারপর তিনি বােনকে ডেকে দয়ামিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, “তােমাদের কাছে যে বইখানা আছে তা
আমাকে একবার পড়তে দাও না দেখি।
.
তার বােন বললেন, “আমাদের আশঙ্কা হয়, বইটা দিলে তুমি নষ্ট করে
উমর দেবদেবির শপথ করে বললেন, ‘তুমি ভয় পেও না। আমি ওটা পড়ে
অবশ্যই ফিরিয়ে দেব।’ একথা শুনে বােনের মনে আশার সঞ্চার হল যে, তিনি
হয়তাে ইসলাম গ্রহণ করবেন। তাই তিনি বললেন, ‘ভাইজান, আপনি মুশরিক
হওয়ার কারণে অপবিত্র । অথচ এই বই স্পর্শ করতে হলে পবিত্রতা অর্জন করা
প্রয়ােজন।
.
উমর তৎক্ষণাৎ গিয়ে গােসল করে পবিত্র হয়ে এলেন। ফাতিমা এবার কুরআন
শরিফ দিলেন। তাতে ছিল সুরা তহা এবং অন্য একটি সুরা। খুলেই তিনি
পড়তে লাগলেন :
وطة * ما أنا عليك القرآن لتشقی لا کر لن يخشى * تنزيلا
من خلق الأرض و التطوير العلى * الرحمن على العرش استوى له ما
في الموت وما في الأرض وما بينا وما تحت الثرى * وإن تجهز
بالقول إنه يغته التي في الله لا إله إلا هو له اسماء اللحنی که
‘তাহা। আমি তােমার প্রতি আলকুরআন এজন্য নাজিল করিনি যে, তুমি দুর্ভোগ পােহাবে; বরং যে ভয় করে তার জন্য উপদেশস্বরূপ। যিনি জমিন ও সুউচ্চ আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ। পরম করুণাময় আরশের উপর উঠেছেন। যা আছে আসমানসমূহ, জমিন ও এ দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং যা আছে মাটির নিচে সব তারই। আর যদি তুমি উচ্চস্বরে কথা বল তবে তিনিগােপন ও অতি-গােপন বিষয় জানেন। আল্লাহ, তিনি ছাড়া
কোনাে (সত্য) ইলাহ নেই; সুন্দর নামসমূহ তারই। এ আয়াতগুলাে তিলাওয়াতের পর হজরত উমর রা, আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘কী সুন্দর কথা! কী মহান বাণী! এ বাণী থেকেই কি কুরাইশরা পালাচ্ছে?’ এরপর
অনবরত তিনি পড়েই চললেন। যখন আল্লাহর এ বাণী এলাে :
إني أنا الله لا إله إ ا قاغبين في وتيم الصلوة ييري ” إن الساعة
اني أكد فيها اجڑی میں بنائی ” فلا يتخلى عنها من لا
يؤمن بها و کوه و دی
“নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনাে (সত্য) ইলাহ নেই; সুতরাং আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম কর। নিশ্চয় কেয়ামত আসবে; আমি তা গােপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে স্বীয় চেষ্টা-সাধনা অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া যায় । অতএব যে ব্যক্তি তার প্রতি ইমান রাখে না এবং স্বীয় প্রবৃত্তির
অনুসরণ করে সে যেন কিছুতেই তাতে ইমান আনতে তােমাকে
বাধা দিতে না পারে; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
এটুকু পড়ার পর বলেন উঠলেন-এ বাণী যাঁর, তাকে ছাড়া অন্য কাউকে
কিছুতেই উপাসনা করা যায় না। আমাকে মুহাম্মাদের কাছে নিয়ে চলাে।
আড়াল থেকে উমরের এ কথা শুনে খাব্বাব বেরিয়ে এসে বললেন,
উমর! তােমার জন্য সুসংবাদ! মনে হয় আল্লাহ তার নবির দোয়া কবুল করে তােমাকে
ইসলামের জন্য মনােনীত করেছেন। গতকাল তিনি দোয়া করেছিলেন :
.
اللهم أعز الإسلام بأحب دين الرجلين إليك، بأبي جهل أو بعمر
بن الخطاب.
.
“হে আল্লাহ, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বাড়িয়ে দাও।’ হে উমর! তুমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও, তুমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও! উমর তখন বললেন, ‘হে খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মাদের সন্ধান দাও। আমি তার কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করি।’ খাব্বাব বললেন, ‘তিনি সাফা পর্বতের কাছে
একটি বাড়িতে কিছুসংখ্যক সাহাবার সাথে অবস্থান করছেন।
.
উমর তাঁর তরবারি কাধে ঝুলিয়ে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবাদের
সন্ধানে চললেন। যথাস্থানে গিয়ে দরজায় করাঘাত করলেন। আওয়াজ শুনে
একজন সাহাবা উঠে এসে জানালা দিয়ে দেখলেন, উমর তরবারি হাতে
দাঁড়িয়ে। তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের
কাছে ফিরে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! উমর দরজায় তরবারি
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’ হামজা রাজিআল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, তাকে
আসতে দাও। যদি ভালাে উদ্দেশ্যে এসে থাকে আমরা তাকে সহযােগিতা
করবাে, আর যদি খারাপ উদ্দেশ্যে এসে থাকে তবে তাকে হত্যা করা কোনাে
কঠিন বিষয় নয়।’
লােকেরা দরজা খুলে দিলে হজরত হামজা রা, এবং আরেকজন সাহাবি উমরের দুই কাধ ধরে রাসুলের খেদমতে নিয়ে গেলেন। রাসুল সা. তাঁকে ছেড়ে দিতে বলেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁর পবিত্র হাত
দিয়ে উমরের কোমর ও চাদর শক্তভাবে ঝাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘হে
খাত্তাবের পুত্র! কী উদ্দেশ্যে এসেছ? আল্লাহর শপথ, আল্লাহর তরফ থেকে
তােমার ওপর কোনাে কঠিন মসিবত না আসা পর্যন্ত তুমি সংযত হবে বলে
আমার মনে হয় না।
.
.উমর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানের প্রতি ইমান আনার জন্যই এসেছি।’ একথা শােনামাত্র রাসুলুল্লাহ সা. এমন জোরে ‘আল্লাহু আকবার বললেন যে, রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের সবাই বুঝতে পারলেন উমর
ইসলাম গ্রহণ করেছেন। হামজার পরে উমরের ইসলাম গ্রহণে রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের মনােবল বেড়ে গেল বিপুলভাবে ।
তাঁরা নিশ্চিত হলেন এই দুজন এখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের প্রতি মুশরিকদের জুলুম-নির্যাতন প্রতিরােধ করতে পারবেন এবং
তারা সবাই তাদের দুজনের সহযােগিতায় মুসলমানদের শত্রুদের মােকাবিলা
করতে সক্ষম হবেন। এরপর সাহাবারা সেই স্থান থেকে নিজ নিজ অবস্থানে।
চলে গেলেন।
.
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঘটনাটির চিত্রায়ণ করেন এভাবে :
.
তিমির রাত্রি – ‘এশা’র আযান শুনি দূর মসজিদে।
প্রিয়-হারা কার কান্নার মতাে এ-বুকে আসিয়ে বিধে!
আমির-উল-মুমেনিন,
তােমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী?
ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তােমারি সে আহ্ববান?
আবার লুটায়ে পড়ি।
‘সেদিন গিয়াছে’ – শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।
উমর! ফারুক! আখেরি নবীর ওগাে দক্ষিণ-বাহু!
আহ্বান নয় – রূপ ধরে এস – গ্রাসে অন্ধতা-রাহু!
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলাে নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলাে ক্ষীণ।
শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি
আর একবার লােহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!
আরব মুলুকে এটা সর্বজন বিদিত বিষয় ছিল যে, উমর ইবনে খাত্তাব অত্যন্ত প্রতাপশালী এবং প্রভাবশালী। তিনি এতই প্রতাপশালী ছিলেন যে, তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতাে সাহস সেই সমাজে কারােই ছিল না। এ কারণে তার
মুসলিম হয়ে যাওয়ার কথা প্রচার হওয়ামাত্র মুশরিক মহলে ক্রন্দন এবং বিলাপ সৃষ্টি হয়ে গেল এবং তারা বড়ই লাঞ্ছিত ও অপমানিত বােধ করতে থাকল। পক্ষান্তরে তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার ফলে মুসলিমদের শক্তি সাহস ও মান
মর্যাদা উল্লেখযােগ্য মাত্রায় বেড়ে গেল এবং তাঁদের মধ্যে প্রবাহিত হতে লাগল।
আনন্দের জোয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.